১।
প্রমিতা চন্দ্রর প্রিয় খেলা রাশিয়ান র্যুলে, এ কথা কোনো এক সাক্ষাৎকারে
তিনি বলেছিলেন। কথাটাকে শ্রোতা এবং পাঠক দেখেছিল তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধের নিদর্শন হিসেবেই।
তাই খেলাটা তিনি নিজে খেলেন কিনা, এ কথা আর তাঁকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি। করলে ভালো হত,
হয়ত।
আজ বহুদিন পর প্রমিতার ইচ্ছে করছে ঝালমুড়ি খেতে। বাড়িতে বানানো নয়, ভিক্টোরিয়া
মেমোরিয়ালের পরিযায়ী ফেরিওয়ালার অ্যালুমিনিয়ামের খোপওয়ালা গোলাকার ডিবেতে রাখা উপকরণ
দিয়ে সর্ষের তেলের খালি টিনে স্টিলের চামচ চালিয়ে বানানো ‘অথেন্টিক’ ঝালমুড়ি। যেমনটা
তিনি খেতেন প্রেমিকাবেলায়, সেই নিটোল ত্বক আর জটপাকানো মগজের কলেজজীবন, যখন চে গ্যেভারাকে
মনে হত পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ পুরুষ। প্রমিতা যার পিঠে ঠেস দিয়ে সেই অথেন্টিক ঝালমুড়ির
মিয়োনো, সরু, তেলচিটে মুড়ি আর চাটমশলা-মাখা কোমল আলু চিবোতেন, তার টি-শার্টে আঁকা থাকত
সততার চুরুট সম্বলিত মুখের বিজ্ঞাপন। প্রমিতার সব প্রেমিকই যদিও ক্লিন-শেভড, চিরকালই,
কারণ তাঁর ত্বক বড় স্পর্শকাতর। আজ আবছা মনে পড়ছে, একসময়ে তাঁর মগজটিও অমন ছিল বটে।
স্পর্শকাতর।
আজ মগজের আর্কাইভ থেকে সেই মুছে-যাওয়া স্পর্শকাতরতা আর ঝালমুড়ির নস্টালজিয়াকে
আলতো আঙুলে পেড়ে এনে, ধুলো ঝেড়ে, মাইনাস আড়াইয়ের চশমার লেন্সের মাধ্যমে খুঁটিয়ে পড়ছে
তাঁর নিস্পৃহ, মাঝবয়সী চোখ। কেন এত ধরণের উপাদেয় খাদ্যের স্বাদ জানা সত্বেও জিভের স্মৃতিকোষে
ওই সর্ষের তেল-জ্যাবজেবে অখাদ্য ঝালমুড়ির স্বাদটা, কোনো এক অজানা ক্রিয়ার চক্রবৃদ্ধি
হারে বাড়তে থাকা প্রতিক্রিয়ার মত, এতদিন পরেও অবিকল উঠে আসে? কেনই বা তাঁর সজাগ মস্তিষ্কের
যুক্তিবোধকে অতিক্রম করে তাঁর অবচেতন স্বাদেন্দ্রিয়র মাধ্যমে এক অযৌক্তিক আবেগকে প্রশ্রয়
দিচ্ছে এখন?
এতদিন মৃত্যু নিয়ে লিখে এসেছেন প্রমিতা। আজ তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন, জীবন
মানে কী।
২।
‘বাঁড়া, মরার আর সময় পেল না!?’ করুণ, ক্লান্ত গলায় বলে উঠল সাব-ইন্সপেক্টর
পশুপতি দাস। নিউ আলিপুর থানায় এইমাত্র ফোনটা এসেছে, রাত আড়াইটে নাগাদ, কাছাকাছি কোনো
এক বহুতল বাড়ির একটা ফ্ল্যাট থেকে। পাশের ফ্ল্যাটে গুলি চলার আওয়াজ শুনেছেন মিস্টার
বাত্রা। আশেপাশের আরো লোকজনও শুনেছে। তিনি সরেজমিনে উঁকিঝুঁকি মেরে, বেল বাজিয়ে, দরজা
ধাক্কিয়ে দেখে এসেছেন ফোন করার আগে, এবং তাঁর ধারণা তাঁর প্রতিবেশী আত্মহত্যা করেছে।
উচ্ছে গেলার এক্সপ্রেশন নিয়ে মুখে মাস্ক আঁটল পশুপতি। এমনিতেই এখন পুলিশের
তনুহ্রদলীলা সম্পন্ন করে রেখেছে সরকার। গোটা দেশ টানা দু’মাস ‘লকডাউন’ হয়ে আছে। অবশ্য,
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রকোপে এই মূহুর্তে প্রায় গোটা পৃথিবীরই সেই হাল। লকডাউন
পালন করার ব্যাপারে প্রাইম মিনিস্টার টিভিতে এসে হুকুম ঝেড়েই খালাস, আর চিফ মিনিস্টার
গাইডলাইন পাঠিয়েই খালাস। হাগামোতাখাওয়াঘুম তো উড়ে গেছে পুলিশের। শহরজুড়ে বিপজ্জনক এলাকা
(রেড জোন)এর ছড়াছড়ি, এসব জায়গায় সংক্রমণ চরমে। নিউ আলিপুরের এই এলাকাটাও তেমনই একটা
জোন, আর লোকজন তো দু’মাস ধরে বাড়িতে বন্দী থাকার পর অবাধ্য বাচ্চাদের মত হয়ে গেছে।
ছুতোয়নাতায় রাস্তায় বেরোচ্ছে, মাস্ক পরছে না, মদ-সিগারেট না পেয়ে হাহাকার করছে। পুলিশ
আপাতত পরিণত হয়েছে গরু-তাড়ানো রাখালে। এর মধ্যে আবার… ফ্ল্যাটের মধ্যে গুলি চলছে! শালা,
ভাবা যায়! খুনফুন হলে তো… হয়ে গেল! আর, আত্মহত্যাই যদি হবে… ভদ্রলোকের মত ঘুমের ওষুধফোষুধ
বা বিষটিষ খেতে পারে না এরা? দু’চারদিন পর বডি বেরোত, নামকাওয়াস্তে পোস্ট মর্টেম হত,
কেস বেশী টানার স্কোপ থাকত না। এখন যাও, গিয়ে রিভলবারের প্রিন্ট নাও, লাইসেন্স খোঁজো,
গুলি খোঁজো, একগাদা স্টেটমেন্ট নাও… উফ!
অবশ্য, পশুপতির কাজ ক্রাইম সিন অবধিই। অলরেডি ইন্সপেক্টর অমিত চৌধুরীকে
সে জানিয়ে দিয়েছে কেসটার ব্যাপারে। অতএব, উচ্ছেটা পুরোপুরি গিলে নিয়ে সে রওনা হয়।
৩।
- - আপনার লেখালিখি নিয়ে যথেষ্ট চর্চা হয় কাগজপত্রে, সোশ্যাল মিডিয়ায়।
আপনি প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন একাধিক, যদিও সেসব আপনাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। তবে সে
প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আপনাকে কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে চাই… অবশ্যই যদি আপনার আপত্তি
না থাকে।
- - জীবনের এই অধ্যায়ে পৌছে ‘ব্যক্তিগত’ বলে আর তেমন কিছুই আগলে
রাখতে চাই না আমি। একটা মানুষের জীবন তত কিছুও মূল্যবান জিনিস নয় যে তাতে সিন্দুকে
তুলে রাখার মত কিছু থাকতে পারে। অন্তত, আমার তো নেই। যদি আমার ব্যক্তিগত কথা অন্তুত
কিছু মানুষেরও আত্মান্বেষণের শুরুয়াৎ ঘটাতে পারে, আমি স্বচ্ছন্দে নগ্ন হব। প্রশ্ন করুন।
- - আপনি বিয়ে করেননি, সেটা হয়ত প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাও হতে পারে।
কিন্তু আপনি কখনও কারো সঙ্গে বসবাসও করেননি বিয়ের বাইরেও। কোনও স্থায়ী সম্পর্ক নেই
আপনার। সারাজীবন একা কাটালেন। এর কারণ কী? কোনো বিশেষ ঘটনা কি এর জন্য দায়ী?
- - ঘটনা জেনে কী হবে, বলুন, পরচর্চা ছাড়া? উনপঞ্চাশের এক প্রায়-বৃদ্ধার
ব্যাপারে এই পরচর্চা আদৌ কোনও যৌন উত্তেজনারও স্ফুলিঙ্গ ছড়াবে কি? বরং, উপলব্ধিটুকু
বলি। না, কোনও বিশেষ ঘটনা নয়, বরং আমার প্রত্যেকটি প্রেমের সম্পর্কই আমাকে ধারাবাহিকভাবে
এই উপলব্ধির দিকে এগোতে সাহায্য করেছে, এবং, অতঃপর, পৌছে দিয়েছে একটা স্থায়ী কনক্ল্যুশনে।
বিবাহ – আইনী, সামাজিক, অথবা অন্য যে কোনও ধরণেরই – আসলে একটা আদানপ্রদান যাকে ব্যবসার ভাষায় ‘ট্রাঞ্জাকশন’ বলা যাবে। আপনি কখনও বেশ্যাপাড়ায় গেছেন? না গিয়ে থাকলেও, বেশ্যাদের সেজেগুজে ক্লিভেজ বার করে খদ্দের ধরতে দাঁড়ানো গলির মুখে, আর খদ্দেরদের হাতে টাকা নিয়ে দাঁড়ানো দর করতে, এ দৃশ্য নিশ্চয়ই আপনার কল্পনার অগোচর নয়। বিবাহ বা লিভ-ইন, যাই বলুন, এগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা খুব আলাদা নয় আসলে, শুধু এই ট্রাঞ্জাকশনের সিগ্নিফায়ারগুলো আলাদা। এক্ষেত্রে, সাধারণত, মেয়েদের দাঁড়াতে হয় সতীত্ব ও সুশীলতার সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে, আর ছেলেদের দাঁড়াতে হয় মাসমাইনের পে-স্লিপ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র হাতে নিয়ে। এছাড়াও অবশ্য আরও সুক্ষ্মতর কিছু কিছু দেনাপাওনার হিসেবনিকেশ থাকতে পারে… হয়ত প্রাথমিক মূল্যায়নে সেগুলোকে আদরের আবদার বলে ভুলও হতে পারে। তবে এই সিস্টেমটাকে একবার চিনে ফেললে, বেশ্যাপাড়াকে অনেক বেশী সৎ মনে হওয়া অবশ্যম্ভাবী। আমারও তেমনই মনে হয়েছে। মূল্যের মুলামুলি সম্বলিত এই দুনিয়ায় আমি বিনামূল্যের হয়ে থাকতেই পছন্দ করেছি… তাই থেকেছি। নিজেকে বিক্রয় করার ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষের ক্ষমতার বাইরে, হয়ত, তবে সে নিজের কোন অংশটি বিক্রি করবে, অন্তত সেটা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা তো তার থাকে। আমি যেমন নিজের মস্তিষ্ক, মেধা, এবং উপলব্ধি বিক্রি করি, তাতে দ্ব্যর্থহীন প্রাইস ট্যাগও থাকে। সেও কিন্তু শরীর, শরীরের বাইরে তো কিছুই নয়…
বিবাহ – আইনী, সামাজিক, অথবা অন্য যে কোনও ধরণেরই – আসলে একটা আদানপ্রদান যাকে ব্যবসার ভাষায় ‘ট্রাঞ্জাকশন’ বলা যাবে। আপনি কখনও বেশ্যাপাড়ায় গেছেন? না গিয়ে থাকলেও, বেশ্যাদের সেজেগুজে ক্লিভেজ বার করে খদ্দের ধরতে দাঁড়ানো গলির মুখে, আর খদ্দেরদের হাতে টাকা নিয়ে দাঁড়ানো দর করতে, এ দৃশ্য নিশ্চয়ই আপনার কল্পনার অগোচর নয়। বিবাহ বা লিভ-ইন, যাই বলুন, এগুলোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা খুব আলাদা নয় আসলে, শুধু এই ট্রাঞ্জাকশনের সিগ্নিফায়ারগুলো আলাদা। এক্ষেত্রে, সাধারণত, মেয়েদের দাঁড়াতে হয় সতীত্ব ও সুশীলতার সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে, আর ছেলেদের দাঁড়াতে হয় মাসমাইনের পে-স্লিপ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র হাতে নিয়ে। এছাড়াও অবশ্য আরও সুক্ষ্মতর কিছু কিছু দেনাপাওনার হিসেবনিকেশ থাকতে পারে… হয়ত প্রাথমিক মূল্যায়নে সেগুলোকে আদরের আবদার বলে ভুলও হতে পারে। তবে এই সিস্টেমটাকে একবার চিনে ফেললে, বেশ্যাপাড়াকে অনেক বেশী সৎ মনে হওয়া অবশ্যম্ভাবী। আমারও তেমনই মনে হয়েছে। মূল্যের মুলামুলি সম্বলিত এই দুনিয়ায় আমি বিনামূল্যের হয়ে থাকতেই পছন্দ করেছি… তাই থেকেছি। নিজেকে বিক্রয় করার ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষের ক্ষমতার বাইরে, হয়ত, তবে সে নিজের কোন অংশটি বিক্রি করবে, অন্তত সেটা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা তো তার থাকে। আমি যেমন নিজের মস্তিষ্ক, মেধা, এবং উপলব্ধি বিক্রি করি, তাতে দ্ব্যর্থহীন প্রাইস ট্যাগও থাকে। সেও কিন্তু শরীর, শরীরের বাইরে তো কিছুই নয়…
- - আপনি যেভাবে দেখাচ্ছেন, আসলে কি প্রেম-ভালোবাসা ততটাই বাজারী
জিনিস? আপনি সত্যি সত্যি প্রেমে পড়েননি কখনও? কখনও কষ্ট পাননি? কখনও ভেসে যাননি, আবেগে?
- - কেন পড়ব না? প্রেমে যখন পড়েছি, সেই সময়ে তো সেই আবেগকে প্রশ্নাতীত
সত্যি বলেই মনে হয়েছে… আর সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? আবেগেও ভেসে গিয়েছি, আঘাতও পেয়েছি,
চরম যন্ত্রণাও পেয়েছি। হয়ত… একাধিকবার। হয়ত… প্রতিবারই যন্ত্রণার মাত্রা বেড়েছে। কিন্তু
ওই যন্ত্রণা কোনও উপলব্ধি এনে দেয়নি। উপলব্ধি তৈরী হয়েছে যন্ত্রণা অতিক্রম করার পর,
আরও অনেক পরে, যখন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে তাকাতে পেরেছি অভিজ্ঞতাগুলোর দিকে, বিচার করতে
পেরেছি যুক্তি সহযোগে। প্রেম বলে আসলে কিছু হয় না। এ এক রূপকথা, একধরণের ম্যাজিক ট্রিক,
যা দিয়ে কিছু অস্বস্তিকর সত্যিকে ঢেকে রাখা হয়। যে প্রেমিক বা প্রেমিকা প্রেমের তাৎক্ষণিক
অভিজ্ঞতায় সিক্ত হয়ে রয়েছে, তার কাছে প্রেম সেই বাস্তব যা জীবনের চরমতম সত্য বলে মনে
হয়। কিন্তু আদতে এ এক ইল্যুশন, এক ধরণের মায়াজাল, যা তার যৌক্তিক প্রশ্ন করার স্পৃহাকে
দুর্বল করে দেয়। আর কিছুই না।
- - আপনি বলছেন… প্রেম আসলে একটা ইল্যুশন? একটা মায়া? প্রেম বলে
আসলে কিছু নেই? সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের অভিজ্ঞতাকে নস্যাৎ করছেন আপনি!
- - হ্যাঁ, অবশ্যই বলছি, এবং নস্যাৎও করছি। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি
মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসের তাগিদে একে অপরকে আক্রমণ করে,
খুন করে, দল বেঁধে পিটিয়ে মারে, বোমা ফেলে উড়িয়ে দেয় আস্ত শহর, প্লেন নিয়ে ধাক্কা দেয়
ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। কিন্তু বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বকে, বা বলা ভালো, যে কাল্পনিক
‘ঈশ্বর’ মানুষ তার প্রবৃত্তি নিরসনের স্বার্থে রচনা করেছে, সেই পার্টিক্যুলার ঈশ্বরের
অস্তিত্বকে কোনওভাবেই স্বীকার করে না। আমিও করি না, আমি নাস্তিক।
সারা পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ দাবী করে তারা ভূত দেখেছে, ভৌতিক অস্তিত্ব অনুভব করেছে। বিজ্ঞান এখনও মৃত্যু পরবর্তী কোনও অস্তিত্বের প্রমাণ পায়নি। আমিও পাইনি, সুতরাং আমিও ভূতে বিশ্বাস করি না।
এই দুটো ব্যাপার মানতে যদি আপনার অসুবিধে না হয়, তাহলে প্রেমের ব্যাপারেই আপনি, বা আপনার পাঠক, স্পর্শকাতর হয়ে পড়ছেন কেন? অধিকাংশের বিশ্বাসই যে ধ্রুব সত্য নাও হতে পারে, এ তো নাস্তিক্যের সূচনাকালে বহুযুগ আগে রচিত ভারতীয় শাস্ত্রও মেনেছে, এমনকী।
সারা পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ দাবী করে তারা ভূত দেখেছে, ভৌতিক অস্তিত্ব অনুভব করেছে। বিজ্ঞান এখনও মৃত্যু পরবর্তী কোনও অস্তিত্বের প্রমাণ পায়নি। আমিও পাইনি, সুতরাং আমিও ভূতে বিশ্বাস করি না।
এই দুটো ব্যাপার মানতে যদি আপনার অসুবিধে না হয়, তাহলে প্রেমের ব্যাপারেই আপনি, বা আপনার পাঠক, স্পর্শকাতর হয়ে পড়ছেন কেন? অধিকাংশের বিশ্বাসই যে ধ্রুব সত্য নাও হতে পারে, এ তো নাস্তিক্যের সূচনাকালে বহুযুগ আগে রচিত ভারতীয় শাস্ত্রও মেনেছে, এমনকী।
- - বিজ্ঞান কি প্রেমের অস্তিত্ব অস্বীকার করে?
- - একরকম, তাইই। বিজ্ঞান বলে, নারীপুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষণ
তৈরী হয় হরমোনের প্রভাবে, যে হরমোন শুধুই ‘লাস্ট’ অথবা যৌন লালসার জন্ম দেয় না, বরং
একধরণের সান্নিধ্যজনিত তৃপ্তি, সেই তৃপ্তিবোধের অভ্যেস, এবং শেষ পর্যন্ত জুটি বেঁধে
সংসার করতে চাওয়ার আকাঙ্খারও জন্ম দেয় বটে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মেটিং লাস্ট’।
এ জিনিস শুধু মানুষ নয়, যে কোনো পশুরই হয়, এবং জীবনে একবারই হবে, এমন বিজ্ঞান কখনওই
বলে না। কিন্তু একমাত্র মানুষই লেখে সেই রূপকথার গল্প, যাতে রাজকন্যার কী কী গুণ থাকলে
রাজপুত্র তার জন্য অশ্বারোহন করবে তা কচি মাথায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করা থাকে। এও গুঁজে
দেওয়া হয় মাথায়, যে কোন কোন গুণ থাকলে রাজকন্যা-লাভের যোগ্য রাজপুত্র হওয়া যাবে। শুধুমাত্র
মানুষই লেখে সেই গল্প, বানায় সেই সিনেমা, যাতে বলা থাকে যে প্রেম আর বিয়ে নাকী জীবনে
একবারই হতে পারে, আর অনুচ্চারিত থাকে এই সাবধানবাণী, যে একাধিকবার হওয়া একরকম ‘অনুচিত’।
একমাত্র মানুষই ‘সত্যিকারের ভালোবাসা’ খুঁজে নষ্ট করে জীবনের বেশ খানিকটা সময়, যখন,
আসলে, এই ‘সত্যি’র ফর্মুলাও তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে সংস্কৃতির সুক্ষ্ম প্রভাব। এ এক
রাজনীতি, যার ধারাবাহিকতা বোঝার প্রয়োজন আছে, সত্যান্বেষণই যদি প্রকৃত লক্ষ্য হয়।
- - আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে, আপনি যেন আপনার তত্বের বেশী
আর কিছুই নন। সত্যিই কি নগ্ন হতে পারলেন আপনি? আপনার কি সত্যিই কোনো দুঃখ নেই? কষ্ট
নেই?
- - সুখ, দুঃখ, মায়া, মমতা, ক্ষোভ, চাঞ্চল্য, আকর্ষণ,
ঘৃণা, এ সমস্তই প্রপঞ্চের অন্তর্গত। মানুষের চারিদিকে এক বাস্তব গড়ে ওঠে৷ দুর্বল মানুষ
সেই বাস্তবকে আঁকড়েই বাঁচতে
থাকে, বাঁচতে বাধ্য হয়। সবল মানুষ বাস্তব তৈরী করতে পারে৷ একইসঙ্গে বিভিন্ন
বাস্তব তৈরী করতে পারে৷ একইসঙ্গে বিভিন্ন বাস্তবে বাঁচতে পারে, এবং সেই বাস্তবগুলিকে
অতিক্রম করে তার বাইরে এসেও দাঁড়াতে পারে মাঝে মাঝে৷ আকাশে বহু উঁচুতে উড়ছে যে ঈগল,
সে যেভাবে নীচের মাটিটার দিকে তাকায়, সেভাবে তাকাতে পারে চাইলে৷ তখন সুখ বা দুঃখ আলাদা
করে আর কিছুই নয়৷ সুখ বা দুঃখ তখন তার নিজের লেখা গল্পের প্লট টুইস্ট মাত্র৷ লেখককে
তার গল্পের মধ্যেই বাঁচতে হয়। কিন্তু তাই বলে কি সে সেই গল্পের স্রষ্টা নয়? স্রষ্টাকে
তার সৃষ্টির বাইরে বেরিয়ে এসেও সেটাকে দেখতে হয়। আবার ঢুকতে হয়, আবার বেরোতে হয়৷ কালচক্রের
মতই অন্তহীন একটা প্রসেস।
- - মানুষের পক্ষে আদৌ এসব সম্ভব নাকী!
- - একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব। মানুষ পৃথিবীর
নৃশংসতম প্রাণী৷ কিন্তু একমাত্র মানুষই স্রষ্টা হতে পারে৷ মানুষই সেই একমাত্র প্রাণী,
যে একইসঙ্গে ঈশ্বর এবং শয়তানকে সৃষ্টি করেছে।
- - কীভাবে সম্ভব! মানুষের তো নিজের আবেগ আছে! অনুভূতি
আছে!
- - থাকে৷ সেটাই তো প্রপঞ্চ। সেটাই তো সেই কল্পিত
অথবা রচিত বাস্তব, যা মানুষ আঁকড়ে থাকে৷ কিন্তু স্রষ্টা পারে তার বাইরে বেরোতে, লেখক
পারে। লেখক পারে, একইসঙ্গে
দ্রৌপদী এবং দুঃশাসন হতে। লেখক পারে হয়ে উঠতে, একইসঙ্গে শার্লক হোমস এবং জিম মরিয়ার্তি৷
লেখক পারে প্রপঞ্চকে অতিক্রম করতে। বাইবেল অথবা কোরান কোনো এক লেখকেরই সৃষ্টি। কথকেরাই সৃষ্টি
করেছিল গীতা, রামায়ণ, মহাভারত৷
- - এভাবে ভাবলে তো পাগল হয়ে যাবে মানুষ!
- - গল্প বলিয়েদের ক্ষমতা অসীম৷ তাই তাদের পাগল হওয়ার
সম্ভাবনাও সীমাহীন। প্রত্যেক স্রষ্টাই একটা সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে। বাস্তব আর অতিবাস্তবের
মাঝখানে একটা সুতো। একটাই জিনিস ম্যাটার করে। কতটা ভালো তার ব্যালেন্স৷ শুধু… এটুকুই।
- - সত্যি বলুন… আপনার একা লাগে না? নাকী সমস্ত প্রতিকুলতার বিপরীতে
চিরকাল এই একা দাঁড়িয়ে থাকাটাকেই আপনি মহত্ব মনে করেন… মনে করেন একটা শিল্প… এ থেকেই
এক ধরণের ‘কিক’ অনুভব করেন আপনি? শুধু এই কারণেই নিজেকে বঞ্চিত করে রাখেন না তো?
- - একা হওয়া কোনো আর্ট অথবা মহত্ব
নয়, একটা প্র্যাক্টিস, দ্বিমুখী। ছবি আঁকলে দুটো বিপরীতমুখী বৃত্তের মত দেখতে হয়। একটা
বৃত্ত ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছে, অন্যটা ক্রমাগত এক্সপ্যান্ড করছে। অর্থাৎ, কতকিছুর মধ্যে
ও কতজনের মধ্যে আমূল মিশে গিয়েও একা হওয়া যায়, বাইরের বৃত্তটাকে ছড়িয়ে দিতে দিতে। বাইরের
বৃত্তটা যত বড় হতে থাকে, ভেতরের বৃত্তটা তত ছোট হয়ে আসে, ছোট হতেই থাকে ক্রমাগত। কখনো
বা হাত ফসকে যায়, এক বৃত্ত অন্য বৃত্তে মিশ খেয়ে যায় খানিক... তরল তো? সবটাই তরল...
গলে গলে পড়ছে, ফোঁটা ফোঁটা। জীবন এক অনন্ত তরল। আবার চলকে উঠে ফিরে আসা... ভেতরের বৃত্তের
সঙ্কোচন... ক্রমাগত। এটাই প্র্যাক্টিস। প্রতিটা মানুষের সান্নিধ্যকে বুড়ি ছুঁয়ে এসেও
কোথাও না আটকানো, কোথাও না দাঁড়ানো। ভেতরের বৃত্তে কোনো ছোঁয়া লাগতে না দেওয়া। সময়ও
তরল, নদীর মত। বয়ে যাওয়ালেই বয়ে যায়, তাকে বাঁধ দিতেও মন চায় না। সময়ের তরলে ভেসে চলা
দুটো বৃত্ত - একাকিত্ব। আমি নিজেকে
গল্প বলা ছাড়া আসলে কিছুই করি না। বাকি যা, সবই অনুসঙ্গ।
৪।
তুলির বড্ড ভয় করে… দিনরাত, রাতদিন। আজকাল বড় বেশী সময় সে ঘুমিয়ে থাকে,
আরেকটু বেশীক্ষণ পালিয়ে থাকতে পারা যায় এভাবে।
মা-মরা মেয়েটার চটজলদি বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিল তার বাবা। মফস্বলের সমাজ,
সে তো ভালো নয়, অনেক কথা হয়। মেয়েটা বড় লক্ষ্মী স্বভাবের, তাও পাড়াপড়শীর জিভে আগল দেবে
কে? মেয়ে কলেজে যায়, শহরে। মাঝেমধ্যে ফিরতে রাতও হয়, টিউশনি সেরে। কথা তো হবেই… সব
কথা হয়ত কানেও আসবে না। কিন্তু তুলি রাজি হয়নি। সে আরও পড়তে চেয়েছিল, চাকরি করতে চেয়েছিল।
বাবা অস্থায়ী কর্মচারী, পেনশন বলে তো কিছু নেই…। সেও যদি বিয়ে করে চলে যায়, বাবাকে
দেখবে কে? দাদা তো অনেক দূরে… অনেক, অনেক দূরে। কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কিনা, কেউ জানে
না…। টাকা পাঠায় বটে, কিন্তু ওই কটা টাকা… আর শুধু টাকা থাকলেই তো হয় না…। লক্ষ্মী
মেয়ে তুলি তাই বিয়ে করতে চায়নি।
‘কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে প্রেমে না পড়া একটা অপরাধ, জানিস?’ বলেছিল সিনিয়র
এক দিদি। তবুও তুলি খুব করে সংকল্প করেছিল, আর যাই করুক, প্রেমে কিছুতেই পড়বে না। বাবা
খুব রাগ করবে, আর তাছাড়া তার তো অনেক দায়িত্ব। সে তো বিয়েই করতে চায় না। প্রেমে পড়বে
কেন? তাই থার্ড ইয়ারের স্বর্ণাভকে সে দাদা বলেই ডাকত, জোর করে। কিন্তু দাদা ডাকতে তার
ইচ্ছে করত না। সে তার নিজের ইচ্ছেগুলোকে ভীষণরকম অস্বীকার করত, জেনেবুঝেই। স্বর্ণাভদারই
বা কী দরকার, অত গায়ে পড়ে বারবার কথা বলার, এটা ওটার ছুতোয়? সে বুঝেও বুঝত না… কিছুতেই
না।
এভাবে বাঁধ দিয়ে দিয়ে তুলি সেকেন্ড ইয়ারে উঠল। তারপর একদিন বাঁধ ভেঙে বন্যা
এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাকে, যেমনটা অবশ্যম্ভাবী। তবে কী, প্রেমে পড়াটা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই,
দুই তরফে সমান সত্যি হয় না। এক তরফে চরম সত্যি হলে অন্য তরফে হাফ-সত্যি বা কোয়ার্টার-সত্যিও
হতে পারে মাঝেমধ্যে…। তুলির কপাল খারাপ। টিউশনি কেটে ঝিলের ধারের নির্জনে তার স্বীকারোক্তি
এবং নিবেদন তাৎক্ষণিক মূহুর্তের নিরিখে খাঁটি দ্বিপাক্ষিক সত্যি হলেও, মূহুর্ত কাটতে
না কাটতেই হয়ে গেল ইউটিউব ভিডিও। নামী সাংবাদিকের একমাত্র ছেলে স্বর্ণাভ তুলিকে বিয়ে
করতে নিতান্তই অক্ষম ছিল। অসাবধানতাবশত, সে তুলিকে বিখ্যাত করে দিল অন্তত। ভিডিওটি
ছড়িয়ে পড়ার পর সে ডিলিটও করে দিয়েছিল অবশ্য। তুলিকে বলেছিল, ভুল করে আপলোড হয়ে গেছে।
ভুল করে রেকর্ড করেছিল কিনা, সে কথা জিজ্ঞেস করার মত অলক্ষ্মী তুলি হতে পারেনি। সুতরাং,
কিছুই বলল না সে। তিন মিনিটের খ্যাতি সম্বল করে ট্রেন ধরতে গেল। পুরোপুরিই সে কাটা
পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু কপাল তার প্রকৃতই খারাপ। কাটা পড়ল শুধু পা দুটো।
তারপর থেকেই… এরকম। সারাক্ষণ খালি ভয় করে। মনে হয়, চামড়ার নীচে পিঁপড়ের
বাসা হয়েছে। পিঁপড়েগুলো কুটকুট করে কামড়ায়, সারাক্ষণ। বুকের ভেতরটা যেন কেউ খামচে রাখে…
সারাক্ষণ। অধিকাংশ সময়ে সে গুটিসুটি পাকিয়ে বিছানায় পড়ে থাকে। বিছানা থেকে উঠেই বা
কী করবে? হুইলচেয়ারটা ঠেলে ঠেলে কতদূরই বা আর যাওয়া যায়? পাশের বাড়ির কাকিমারা জানে,
তুলির আর কখনও বিয়ে হবে না। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, সে যা চেয়েছিল তাইই হয়েছে। সে অবশ্য
চাকরি করতেও চেয়েছিল। যাক… সব চাওয়া তো পূরণ হয় না। বাবা কী কী বলেছিল, এখন আর ভালো
করে মনে পড়ে না। কী কী বলে বিড়বিড় করে, ভালো শুনতেও পায় না তুলি।
শুধু বাবার চিৎকার করে বলা একটাই লাইন বারবার তার কানে বাজতে থাকে, ‘তুই
মরলি না কেন??’
৫।
ইন্সপেক্টর চৌধুরী, মানে অমিত, দু’আঙুলে মাথার রগ টিপে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তার কেরিয়ারের সবচেয়ে জটিল কেস এটা, নাকী সবচেয়ে সহজ? কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না
সে। মৃতা ব্যক্তির নাম প্রমিতা চন্দ্র। এই মূহুর্তে বাংলার সবচেয়ে কুখ্যাত লেখিকা।
হ্যাঁ, বিখ্যাত’র চেয়েও বেশী কুখ্যাত ইনি, ওনার অদ্ভূত সব থিওরি আর চরম ভাটের লেখাপত্রের
কারণে। কী না লিখেছেন এই মহিলা। বিয়ে মানে বেশ্যাবৃত্তি, প্রেম আসলে ইল্যুশন, আত্মহত্যা
একটা নির্দোষ চয়েস… মানে… এর চেয়ে বললেই হয়, মানুষ আসলে পেঙ্গুইন, এই যে মনে হচ্ছে
আমরা মানুষ, এটা একটা ভ্রম? যত্তোসব! অমিত একটা জিনিস বুঝতে পারে না, যে ইনি এত জনপ্রিয়
কেন? ঠিক কীভাবে? মানুষ একবারের বেশী দু’বার এঁর লেখাগুলো পড়েই বা কেন? এদিকে এত প্রতিবাদ,
এত আউটরেজ এঁর বিরুদ্ধে শহরময়, আর ওদিকে সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এই
মহিলার লেখা বইয়ের। লোকে বই কিনছে, পড়ছে, তারপর খুন করার হুমকি দিচ্ছে লেখিকাকে। তারপর
আবার কিনছে, আবার পড়ছে! ভাবা যায়? আসলে… ঠিকই। মানুষ পেঙ্গুইন না হলেও, গাধা তো বটেই!
কিন্তু এখন এই কেসটার কী করা যায়? মহিলার মৃত্যু তো ওঁর চেয়েও বেশী অদ্ভূত দেখা যাচ্ছে!
কীভাবে যে মরলেন ইনি, তারই কোনও কুলকিনারা করতে পারছে না অমিত। চেয়ারে বসে
বসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন মিস চন্দ্র। চেয়ারের নীচে পড়ে ছিল তাঁর লাইসেন্স করা নিজস্ব
রিভলবার, এবং সেই রিভলবারে আঙুলের ছাপও তাঁর নিজেরই। রিভলবারটা খালি। সম্ভবত, একটাই
গুলি ভরা ছিল ওতে, যেটা ফায়ার করা হয়েছে। সেটাও পাওয়া গেছে খুঁজে। বসার ঘরের মেঝে ভেদ
করে ঢুকে গেছে গুলি, চেয়ার থেকে একটু দূরে। অর্থাৎ, উনি চেয়ারে বসা অবস্থায় গুলি চালিয়েছেন
মেঝেতে। কেন? ঠিক কেন? আশ্চর্য! আত্মহত্যাই যদি উদ্দেশ্য হবে, তাহলে অন্তত বডির কাছাকাছি
কোথাও গুলিটা পাওয়া যাওয়ার কথা তো… যদি বা শেষ মূহুর্তে হাতও ফস্কে থাকে। মেঝেতে কেন?
এমন নয় তো, যে মহিলার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল? একে তো সারাজীবন একা থেকেছেন, তার ওপর
লকডাউন চলাকালীন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হচ্ছিল না। অবশ্য, অমিত খবর নিয়ে জেনেছে
যে এঁর সোশ্যাল লাইফ বলতে তেমন কিছু ছিলও না খুব একটা। মাত্র তিনজন বন্ধু, তাদের স্টেটমেন্ট
নিতে হবে…। আচ্ছা… কোনওকিছু হ্যালুসিনেট করে সেইদিকে ফায়ার করেছেন কি এই মহিলা?
কিন্তু তাইই যদি হবে, ইনি মারা গেলেন কীভাবে? শরীরের কোথাও কোনও ক্ষত নেই,
গুলি তো লাগেইনি। অথচ, মিস চন্দ্র সন্দেহাতীতভাবে মৃত। বাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল,
পুলিশকে দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়েছে। প্রতিবেশীদের কথা অনুযায়ী মিস চন্দ্র এই দু’মাস বাড়ি
থেকে একেবারেই বেরোননি। অনলাইন ডেলিভারি দিয়েই কাজ চালিয়েছেন। কাজের লোককেও পুরোপুরি
ছুটি দিয়ে রেখেছিলেন, একদিনও সে আসেনি। আচ্ছা… তার মানে উনি লকডাউনের নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে
পালন করছিলেন। কিন্তু… যে ব্যক্তি সুইসাইডাল, সে ভাইরাসের ব্যাপারে এতটা সতর্ক থাকবে
কি?
যত ভাবছে ততই মাথার মধ্যে পুরোটা জট পাকিয়ে যাচ্ছে অমিতের। যাই হোক, বডি
পাঠানো হয়েছে পোস্ট মর্টেমের জন্য। এখন রিপোর্টের অপেক্ষা। রিপোর্ট এলে তবেই কিছুটা
খোলসা হবে ব্যাপারটা।
৬।
-
- তাহলে একাকিত্বকে কখনও বোঝা বলে মনে হয় না আপনার? কথা বলতে
ইচ্ছে করে না কারও সঙ্গে?
- - অন দ্য কন্ট্রারি, আমার একা থাকতে ভালো লাগে। শব্দ ব্রহ্ম,
এ আমি মানি। সেই শব্দের দৈনন্দিন নিরন্তর অপচয় আমাকে ক্লান্তি ছাড়া আর কিছুই দেয় না।
আসলে, মানুষের বলার মত কথা খুবই কম। আট থেকে বারো ঘন্টা সময়ে একজন সাধারণ মানুষের এযাবৎ
গোটা জীবনের প্রয়োজনীয় বিবরণ সম্পন্ন করা যায়। তবুও মানুষ নিরন্তর কথা বলে চলে একে
অপরের সঙ্গে, সারাক্ষণ, যেন একরকম জানান দিয়ে যেতে চায়, যে সে বেঁচে আছে। এটাই বড্ড
ক্লান্তিকর, এই ক্রমাগত মন্থন, এই অশেষ লালসা, শুধু বেঁচে থাকার জন্যেই বেঁচে থাকার…।
আমি কথা কম বলি। চুপ করে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা, যাতে শব্দ তার স্বমহিমায় ধরা দেয় আমার
কাছে। তারপর অবশ্য লিপিবদ্ধ করি সেই শব্দকে, বেঁধে ফেলতে চাই সাদা কালোয়, হয়ত আমিও
মানুষ বলেই, মানুষের মত ফ্রিভোলাস বলেই…।
- - বেঁচে থাকার প্রসঙ্গ যখন এলোই… এবার আসল কথায় আসা যাক। আপনার
লেখা বইয়ের বক্তব্য কিন্তু খুবই বিতর্কিত। বিস্ফোরকও বটে। আপনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর চেয়ে
অধিক সুখের মূহুর্ত বিরল। মানুষের গোটা জীবনই আসলে একটা অপেক্ষা, মৃত্যুর জন্য’। এ
কথা আপনি কেন লিখলেন? জনপ্রিয় হওয়ার জন্য এতদূর যাওয়ারও কি দরকার ছিল?
- - জনপ্রিয়তা… সে অন্য প্রসঙ্গ। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিই। কেন
লিখলাম…? এ কথা সত্যি বলে।
- - আপনি সত্যিই বলতে চান… যে মৃত্যু সুখের? আপনি এও লিখেছেন… যে
‘মৃত্যুশোক আসলে এক ধরণের অভিনয়, একটা পার্ফর্ম্যান্স’! এটাও…
- - সর্বৈব সত্য, আমার জ্ঞাতার্থে। আসুন, যুক্তিক্রম সহকারে ব্যাপারটাকে
দেখি। মানুষ যে মূহুর্তে জন্মায়, এমনকী, জন্মানোর আগেও, যে মূহুর্তে ভ্রুণ হয়ে সে মায়ের
পেটে মূর্ত হতে শুরু করছে, সেই মূহুর্ত থেকেই তার সম্বন্ধে কেবলমাত্র একটা কথাই তো
বলা যায়, নিশ্চিতভাবে। এটাই, যে তার মৃত্যু ঘটবে। সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেও, তার নামকরণের
আগেও, এ কথা তো নিশ্চিত, যে তার মৃত্যু ঘটবে। যখন সে শিশুকাল পেরিয়ে বোধ অর্জন করে,
তখন ধীরে ধীরে তার নিজের কাছেও, তথ্য হিসেবে, এ তো এক নিশ্চয়তাই, যে সে মারা যাবে।
মানুষ তার গোটা জীবনটা কাটায় এই নিশ্চয়তাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে। অন্তত, সচেতনভাবে
সে অস্বীকার করে, যদিও তার অবচেতন তাকে সত্যের দিকেই ঠেলে দেয় বারংবার। এমনটাও মনে
হতে পারে, যে মানুষ এভাবেই বাঁচে যেন সে কখনও মরবে না। অথচ না, ব্যাপারটা তা নয়। তাহলে
তো, লাইফ ইন্সিওরেন্স বলে কোনও বস্তুই থাকত না পৃথিবীতে। যে মূহুর্তে মানুষ এই পলিসিগুলো
করায়, সেই মূহুর্তে সে কী নির্দ্বিধায় নিজ মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছে না? আসলে… অবচেতনে
প্রতিটা মানুষই অপেক্ষা করছে মৃত্যুর জন্য। তার বেঁচে থাকাটা আদতে এক প্রকার সময় কাটানো,
অপেক্ষাকালীন।
- - মেনে নেওয়া আর চাওয়া দুটো আলাদা জিনিস নয় কি? মানুষ তো বাঁচতেই
চায়! যে করে হোক, বেঁচে থাকতেই চায়!
- - সেটা তার পাশবিক প্রবৃত্তি। সার্ভাইভাল। কিন্তু মানুষ বুদ্ধিমান
প্রাণী। সে জানে, কিছু কিছু বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। যেমন বৃদ্ধ এবং অথর্ব
হয়ে, অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা। যেমন, অন্যের অনুগ্রহে খাদ্যগ্রহণ তো বটেই, মলমূত্রও
ত্যাগ করতে হওয়া। তাই, সক্ষম থাকতে থাকতে মারা যাওয়া যে কোনও মানুষের জন্য সুখের, তাইই
কাম্য, যুক্তিক্রম সেটাই বলছে। হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন, অধিকাংশ মানুষ এই যুক্তিক্রম
মেনে নিতে অক্ষম। তারা তাদের পাশবিক প্রবৃত্তির দাস। মানুষ যখন বেঁচে থাকে, সেই বেঁচে
থাকার অধিকাংশটাই আসলে সুখের হয় না।
অধিকাংশ মানুষ প্রতিটা মূহুর্ত সম্পূর্ণরূপে বেঁচে নিতে অক্ষম। নিজের সমস্ত ইচ্ছে এবং স্বপ্নকে সম্পূর্ণরূপে সুযোগ দিতে অক্ষম। তারা অপেক্ষা করে থাকে, ঠিক সময়ের। একদিকে তারা ধরে নেয়, তাদের হাতে অনেক সময়। অন্যদিকে, তারা সারাক্ষণ ভয় পায়, যে কোনও ধরণের রিস্ক নিতে, বাজি ধরতে। এমন ভাব করে, যেন সাংঘাতিক দামী কিছু তাদের আছে, হারানোর জন্য। এর ফলে, এক কৃত্রিম ভয় তাদের গ্রাস করে, যা আসলে অতৃপ্ত আকঙ্খা নিয়ে মরতে হওয়ার ভয়। মানুষ ভাবে, এই বুঝি মৃত্যুভয়। এই ভয়ে কুঁকড়ে, জবুথবু হয়ে, যে কোনও মূল্যে বেঁচে যাওয়া, এভাবে বেঁচে থাকা… এটাকেই কি আপনি সুখ বলবেন? আসলে, অধিকাংশ মানুষই বুঝতে চায় না, মানুষ মহাকালের হিসেবে কতটা ক্ষুদ্র। নিজেকে বিশাল, বড় বিশাল কিছু ভাবে। নিজেকে আগলে রাখতে রাখতে হারিয়ে ফেলে নিজেকেই। নাহ, একে আমি সুখ বলি না। বরং, আমি দেখি জীবনকে বয়ে চলতে, মৃত্যুতে মিশবে বলে, নদী যেমন বয়ে চলে সমুদ্রের জন্য। সমুদ্রে পৌছনর যে মূহুর্ত, তা সুন্দর তো বটেই…
অধিকাংশ মানুষ প্রতিটা মূহুর্ত সম্পূর্ণরূপে বেঁচে নিতে অক্ষম। নিজের সমস্ত ইচ্ছে এবং স্বপ্নকে সম্পূর্ণরূপে সুযোগ দিতে অক্ষম। তারা অপেক্ষা করে থাকে, ঠিক সময়ের। একদিকে তারা ধরে নেয়, তাদের হাতে অনেক সময়। অন্যদিকে, তারা সারাক্ষণ ভয় পায়, যে কোনও ধরণের রিস্ক নিতে, বাজি ধরতে। এমন ভাব করে, যেন সাংঘাতিক দামী কিছু তাদের আছে, হারানোর জন্য। এর ফলে, এক কৃত্রিম ভয় তাদের গ্রাস করে, যা আসলে অতৃপ্ত আকঙ্খা নিয়ে মরতে হওয়ার ভয়। মানুষ ভাবে, এই বুঝি মৃত্যুভয়। এই ভয়ে কুঁকড়ে, জবুথবু হয়ে, যে কোনও মূল্যে বেঁচে যাওয়া, এভাবে বেঁচে থাকা… এটাকেই কি আপনি সুখ বলবেন? আসলে, অধিকাংশ মানুষই বুঝতে চায় না, মানুষ মহাকালের হিসেবে কতটা ক্ষুদ্র। নিজেকে বিশাল, বড় বিশাল কিছু ভাবে। নিজেকে আগলে রাখতে রাখতে হারিয়ে ফেলে নিজেকেই। নাহ, একে আমি সুখ বলি না। বরং, আমি দেখি জীবনকে বয়ে চলতে, মৃত্যুতে মিশবে বলে, নদী যেমন বয়ে চলে সমুদ্রের জন্য। সমুদ্রে পৌছনর যে মূহুর্ত, তা সুন্দর তো বটেই…
- - এ তো আপনার মত। যে বাপমায়ের সন্তান অপঘাতে মরল কচি বয়সে, তাদের
এই থিওরি আপনি বোঝাতে সক্ষম হবেন তো? অবশ্য আপনার মতে তো… মৃত্যুশোক এক ধরণের অভিনয়…
- - অভিনয়… হ্যাঁ, অবশ্যই অভিনয়। যদিও, সেই অভিনয়ও সাধারণত স্থায়ী
হয় বাহাত্তর ঘন্টার বেশী নয়। তারপর সেই শোক আর থাকে না, থাকে শোকের স্মৃতি। মানুষের
লালসা এতই, যে স্মৃতিটাকেও সে আঁকড়ে থাকে, ফেলতে পারে না। তবে হ্যাঁ, অভিনয়। প্রিয়জনের
মৃত্যু ঘটলে মানুষ যে শোক করে, সে শোক সেই প্রিয়জনের মৃত্যুর ঘটনাটির জন্য নয়, বরং
সেই মৃত্যুটির ফলে তার নিজস্ব যে স্বার্থহানি হল, সেই কারণে। কিন্তু এ কথা সে স্বীকার
করতে অক্ষম, তাই মৃত্যুশোককে সে দেখতে চায়… দেখাতে চায়… নিঃস্বার্থ এবং মহৎ এক আবেগ
হিসেবে। সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণা, তাকে বড় করে তোলার আত্মত্যাগ, তার বড় হয়ে ওঠা
নিয়ে যাবতীয় আশা-আকাঙ্খা, এই সমস্ত ইনভেস্টমেন্ট এক লহমায় লসের খাতায় চলে গেল… শোক
তো হবেই। মানুষের প্রিয়জন, নানাভাবে, তার জন্য আশ্রয় হয়ে ওঠে, তার অবলম্বন হয়ে ওঠে।
মৃত্যুশোক সেই অবলম্বন হারানোর, সেই আশ্রয় হারানোর, মৃত মানুষটার জন্য তত নয়। হ্যাঁ,
খুব তীব্র আবেগ। আবেগ মানুষকে ভাবায় না, তাই সে উপলব্ধি করে না নিজেও, যে সে কার জন্য
কাঁদছে। আসলে, মানুষ নিজের জন্যেই কাঁদে, চিরকালই। সে শোক ‘পালন’ করে, তাই না? পার্ফর্ম্যান্স
নয়? আর… হবে না’ই বা কেন? মৃত্যু যে যন্ত্রণার, মৃত্যু যে এক অন্ধকার, এ কথা তো আদৌ
কেউ নিশ্চিত জানে না। মৃত্যুর পর কী আছে, কেউ কি জানে? মানুষ মৃত্যুকে যখন ভয় পায়,
সে আসলে ভয় পায় এক অজানা পরিণতিকে। হ্যাঁ, সে অজানাকে ভয় পায়। এ তার মানসিক ক্ষুদ্রতাই
বটে। মৃত্যু সুখের নয়, তা আপনিই বা জানেন কীভাবে? কীভাবেই বা জানবেন, মৃত্যুর আগে?
- - তার মানে, আপনি বলতে চান, কেউ যদি মৃত্যুকে ‘আবিষ্কার’ করতে
চায়, তার সে স্বাধীনতা থাকা উচিৎ?
- - অবশ্যই… অবশ্যই থাকা উচিৎ। আত্মহত্যা ব্যাপারটাকে নিয়ে, বরং,
আমাদের আরেকটু স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন। কেন দেখতে হবে ব্যাপারটাকে, অপরাধ হিসেবে? কেন
ভাবতে হবে, এ এক পলায়নপরতা? অথবা, যদিও হয়ও পলায়ন… জীবন কি এতই মহার্ঘ্য কিছু, যার
থেকে পালিয়ে যাওয়া অপরাধ বলে গণ্য হবে? এমনিতেও, আমাদের বেঁচে থাকার অধিকাংশটাই ফলিত
জীবনের চেয়ে বেশী জীবনের প্রতি নস্টালজিয়া নয় কি? কেন, বলুন তো, মানুষ অন্য অপশনটা
বেছে নিতে পারে না? যা নিশ্চিত জানে বোধোদয়ের পর থেকে, তাকে সুনিশ্চিত করতে এত দ্বিধা
করতেই বা হবে কেন? বরং, অপঘাতে মৃত্যুর মধ্যে এক ধরণের যন্ত্রণা আছে, কারণ তা আকস্মিক।
তা মানুষকে ভাবার সময় দেয়নি। কিন্তু আত্মহত্যা তো একটা চয়েস। ভেবে দেখুন, নয় কি? কেন
জীবনকে প্রত্যাখ্যান করা অপরাধ, তা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন? কেন অপরাধ, মৃত্যুকে
বেছে নেওয়া? বরং, মানুষের অধিকাংশ ভয় এবং ইনসিকিওরিটি আসে এখান থেকেই, যে সে জানে সে
মারা যাবে, কিন্তু জানে না কবে ও কখন। মৃত্যুভয়ের অনেকটাই আসলে তৈরী হয় মৃত্যুকে একটা
‘অ্যাবস্ট্র্যাক্ট’ হিসেবে দেখার ফলে। কিন্তু যদি মানুষ নিশ্চিত জানে তার নিজের মৃত্যুর
তারিখ এবং সময়, যদি এই ঘটনাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তার জন্য এর চেয়ে ভালো হয়ত
আর কিছুই হয় না। সে তখন সেই লক্ষ্যে পৌছনর আগে প্রতিটা মূহুর্ত পূর্ণভাবে বেঁচে নিতে
শুরু করে। সে যতই কম সময় হোক, তার চেয়ে আনন্দের সময় আর হয় না…
৭।
সে তো মরতেই চেয়েছিল… পারেনি। ব্যর্থ হয়েছে সে, আর তার ব্যর্থতার শাস্তি
তার বাকি জীবনটা, যা তাকে এবার বয়ে চলতে হবে। দীর্ঘ, দীর্ঘ দিন… কতদিন, কে জানে? কতদিন
বাঁচবে সে? তুলি জানে না। যখনই সে এ ব্যাপারে ভাবে, বুকের ভেতরটা এত জোরে খামচে ওঠে
যে দম বন্ধ হয়ে আসে তার।
তুলির শুয়ে থাকতে থাকতে একটা বেডসোর মত হয়েছে। বাবাকে সে বলেনি… বলতেও তার
ভয় লাগে। নিজেই কোনওমতে বোরোলিন লাগিয়ে রেখেছে। পুরো পনেরো মিনিট সে খুব করে চাইল,
বোরোলিনেই সেরে যায় যেন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, আজ পর্যন্ত যা’ই খুব করে চেয়েছে, ঠিক
তার উল্টোটাই হয়েছে। শুধু উল্টোটা নয়, বরং সে যা চায় তা যাতে কিছুতেই না পায়, এমন কোনো
এক ষড়যন্ত্র চলছে যেন কোথাও একটা। এটা ভাবতেই তার আরও একবার ভয় করল… নিদারুণ ভয়। তার
জন্য আয়া রাখার টাকা বাবার নেই। সে নিজে নিজেই অনেক কিছু পারে, যদিও। পিরিয়ডস হলে ভীষণ
সমস্যা হয়… লজ্জাও… পাছে বাবা দেখে ফেলে… তবু, সে কোনওমতে চালিয়ে নেয়। এক্ষুনি তার
মনে হল, যদি তার পিরিয়ডস আর জ্বর একসঙ্গে হয়? তখন তো সে পারবে না নিজে নিজে… নড়াচড়া
করতে যে প্রবল পরিশ্রম হয় তার…। তখন যে বলতেই হবে বাবাকে! প্রচন্ড, প্রচন্ড ভয় করল
তার। আজকাল, এমনিতেও, বাবাকে দেখলেই তার ভয় করে। বাবার চোখদুটো কেমন মরা মাছের চোখের
মত নির্জীব হয়ে গেছে। সেই চোখদুটো যখন তার দিকে তাকায়…
ভয় কাটানোর জন্য সে আঁতিপাতি করে তাকাল চারদিকে। তখনই তার চোখে পড়ল বইটা।
‘মৃত্যু এবং এক বালিকা’ – বইটার নাম। এই বইটা কোত্থেকে এলো? কী অদ্ভূত নাম! বিছানার
উল্টোদিকের তাকে আরও কয়েকটা বইয়ের মাঝখান থেকে লাজুকভাবে উঁকি মারছে বইটা, তুলিকে টানছে
যেন…। হঠাৎ মনে পড়ল, নামটা দেখেই খেয়ালের বসে কিনেছিল সে এটা, বইমেলা থেকে। ভেবেছিল,
বইটা পড়ে স্বর্ণাভদার সঙ্গে আলোচনা করবে। তারপর… আর পড়া হয়নি…। হঠাৎ, অনেকদিন পর, একটা
তীব্র ইচ্ছে ভর করল তুলির ওপর। বইটা পড়ে ফেলার ইচ্ছে। হেঁচড়ে হেঁচড়ে বিছানার কোন অবধি
পৌছে বইটা টেনে আনল সে তাক থেকে। উলটে দেখল, লেখিকার সইও আছে ভেতরে… সে সই নিয়েছিল…
মনে পড়ল।
‘তুলিকে, শুভেচ্ছাসহ, প্রমিতা চন্দ্র’।
পাতা উলটে এগিয়ে গেল সে। শেষ দেখা যায় না এমন এক খাদের ধারে একটা ছোট্ট
কাঠের বাড়ি বানিয়েছে এক বালিকা। রোজ সে ঝুঁকে দেখে, খাদটা কত গভীর… সে জানতে চায়, খাদের
শেষে কী আছে। একদিন তার পাশে এসে দাঁড়ায় এক সুঠাম দেহের যুবক। তার কানের কাছে ঠোঁট
এনে ফিসফিস করে বলে, ‘আমি মৃত্যু। তুমি আমাকে ডাকছিলে?’ চমকে তাকায় বালিকা। তার চোখে
ভয় আর অবিশ্বাস…
পড়তে পড়তে বিভোর হয়ে গল্পে ঢুকে পড়ে তুলি। নিজেকে পুরোপুরি ভুলে যায় সে।
৮।
ইনিশিয়াল পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে। অমিত এখন খানিক নিশ্চিন্ত বোধ
করছে। কার্ডিয়াক ফেলিওর, মৃত্যুর কারণ। আচ্ছা… তবে এই তথ্যের ওপর নির্ভর করে ইনভেস্টিগেশন
রিপোর্টটা লিখে ফেলাই যেতে পারে। এমনিতেও, তাড়া আছে। এই লকডাউনের মধ্যেও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা
বাদ দিয়ে মিডিয়া শকুনের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রমিতা চন্দ্রের মৃত্যুরহস্যের ওপর। আর দেরী
করলে ব্যাপারটা ‘হয়ত খুন’ থেকে ‘ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি’ হয়ে ‘মৌলবাদীদের চক্রান্ত’ পর্যন্ত
গড়িয়ে নিয়ে যাবে মিডিয়া, যার ফলে এমনকী ল-অ্যান্ড-অর্ডারও বিঘ্নিত হতে পারে। ওদিকে
সারা বছর সবধরণের রাজনীতির লোকই গালাগাল দেয় মহিলাকে, সব ধর্মের লোকই পালা করে থ্রেট
দেয়… এদিকে যেই তিনি টেঁসে গেছেন, একাধারে সক্কলের দরদ একেবারে একসঙ্গে উথলে উঠেছে।
কে কার চেয়ে বেশী দরদী তার কম্পিটিশন চলছে। এবং সেইসঙ্গে চলছে একে অপরকে ব্লেম করা।
আসলে, এই লকডাউন-টাউনের ফলে মানুষ যথেষ্ট বোরও হয়েছে। এবার, খানিক সেনসেশন পেয়ে লাফিয়ে
উঠেছে।
এই মহিলার একটা ইন্টারভিউ পড়েছিল অমিত। অধিকাংশ কথাই মাথার ওপর দিয়ে গেছে,
কিন্তু কয়েকটা কথা বোধয় মহিলা খুব ভুলও বলেন না। যাই হোক… রিপোর্টে ফেরা যাক। ওপর থেকে
চাপও আসছে রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য।
তাহলে… ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? পঞ্চাশোর্ধ প্রবীণা, হার্টের ব্যামো থাকা
আশ্চর্য নয়। একা থাকতেন, ডিপ্রেশন তো ছিলই ধরে নেওয়া যায়… যা সব লিখতেন! হয়ত, আত্মহত্যাই
করতে চেয়েছিলেন। এবার… রিভলবার কপালে ঠেকিয়েই ফায়ার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মূহুর্তে
ভয় পেয়ে যান, দ্রুত রিভলবার সরিয়ে নেন, কিন্তু রিফ্লেক্সে ট্রিগারে চাপ পড়ে যায়, এবং
গুলি গিয়ে লাগে মেঝেতে। ঠিক আছে…। এবার… সেই গুলির শব্দ, এবং আত্মহত্যার প্রস্তুতির
যে মানসিক চাপ, তার যে বিল্ড-আপ, সব মিলিয়ে তীব্র একটা ধাক্কা পান, হার্ট ফেল করে,
এবং… মারা যান। এই তো, পার্ফেক্ট। লজিকে কোনও ফাঁকই নেই। ব্যাস, খতম। তবু, রিপোর্টটা
জমা দেওয়ার আগে একবার ফরেন্সিক এক্সপার্ট সান্যালকে দেখিয়ে নেওয়া জরুরি, যিনি পোস্ট
মর্টেমটা করছেন।
তীর্থ সান্যালের রিপোর্টটা পড়তে লাগল ঠিক চার মিনিট। এটা ভালো কথা। তার
মানে জটিলতাবিহীন কনক্ল্যুশন হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টটা নামিয়ে রেখে এই যে তিনি ভুরুটুরু
সাংঘাতিক কুঁচকে দেওয়াল দেখছেন, এইটা ভালো কথা নয়। আরও দু’মিনিট অপেক্ষা করে গলা খাঁকরাল
অমিত।
- - তাহলে… সান্যালদা? ঠিক আছে তো?
- - হুমম… কীরম একটা… খটকা… জানো…
- - আবার কী খটকা!
- - আসলে, মিস চন্দ্রর মেডিক্যাল হিস্ট্রি চেক করছিলাম তো…
- - তো?
- - হার্টের প্রব্লেম তো নেইই… বরং বয়সের তুলনায় হার্ট বেশ স্ট্রং…
এবং খবরে পড়লাম, উনি নাকি এই দশ বছর আগেও অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্রেক করে এসেছেন…
- - আপনি কী বলতে চাইছেন?
- - কার্ডিয়াক ফেলিওর তো হয়েছে বটেই… কিন্তু ব্যাপারটা এতটাই আনলাইকলি…
মানে, কোনও এক্সটার্নাল ক্যাটালিস্ট ছাড়াই… কী করে…
- - সান্যালদা… সুইসাইড কেস। মানসিক চাপ, গুলির শব্দ। যে গুলিটা
ওনার নিজের খুলিতে ঢোকার কথা। ক্যাটালিস্ট নয়?
- - দেখো… সবই বুঝলাম… কিন্তু বাকি রিপোর্টগুলো… মানে ওই টক্সিকোলজির
রিপোর্টটা না আসা পর্যন্ত… আমার মনে হয়… অপেক্ষা করো হে…
- - আবার অপেক্ষা কেন? এ তো মাইরি আপনি কমপ্লিকেট করবেন দেখছি!
- - আমি কি আর করব? করলে বিজ্ঞান করবে রে ভাই…। একবার কনফার্ম করে
নিতে ক্ষতি তো নেই…
এবার অমিতের ভুরু কুঁচকে গেল, যারপরনাই।
৯।
- - প্রমিতা, আপনি মৃত্যুর মত একটা গম্ভীর বিষয় নিয়ে এত হাল্কাভাবে
কথা বলছেন কীভাবে? ব্যক্তিগত শোককে নাহয় আপনি স্বার্থপরতা বলে নস্যাৎ করলেন, কিন্তু
গোষ্ঠির শোক? কী বলবেন, হলোকস্ট সার্ভাইভারদের অভিজ্ঞতাকে? তৎসংক্রান্ত যে রাজনীতি?
কী বলবেন, কাশ্মীর, গুজরাত, বাংলাদেশ…
- আপনাকে আলাদা আলাদা করে নাম নিতে হচ্ছে, দেখেছেন? শোককে গোষ্ঠি
অনুযায়ী ভাগ করতে হচ্ছে। এটা কেন, বলুন তো? মানুষ মরেছে, তাতে অপর মানুষের শোক, এই
তো? অনেক মানুষ মরেছে, তাতে অপর অনেক মানুষের শোক, তাই তো? তবে গোষ্ঠি আসে কোত্থেকে?
কারণ শুধু ‘মানুষ মরেছে’, এটা শোকের জন্য যথেষ্ট নয়। গোষ্ঠির শোক চাগিয়ে তোলার জন্য
এটা ভাবা এবং ভাবানো জরুরি, যে ‘আমার মানুষ মরেছে’। মালিকানার সত্ত্ব নির্ধারণ না করলে
কোনও শোকই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে না। আর শোক রাজনৈতিক না হয়ে উঠলে ইতিহাসের পাতায় তার দাম
কানাকড়িও নয়। অপর মানুষের মৃত্যু, ধর্ষণ, অঙ্গহানি, ইত্যাদি সমস্তকিছুকেই মানুষ, এক্ষেত্রেও,
নিজ স্বার্থেই ব্যবহার করে। ব্যক্তিগত না হলে গোষ্ঠির স্বার্থে। প্রতিহিংসাকে রাজনীতির
ক্যাটালিস্ট করে তোলার স্বার্থে। ফলে, সে শোকও স্বার্থান্বেষণই বটে। তার বেশী কিছুই
নয়। ‘লাশের রাজনীতি’ প্রত্যেকেই করে, ব্যক্তি অথবা গোষ্ঠি। বিভিন্ন ফর্মে করে, করে
বিভিন্ন মোড়কে। আপনি নিজেই ভেবে দেখুন না… ব্যক্তির মৃত্যুতে কেন শোকই ‘পালন’ করতে
হয়, কেন শোক ছাড়া অন্য কিছু পালন করাকে আপনি ‘ইনহিউম্যান’ বলবেন? কোনও যৌক্তিক কারণ
কি খাড়া করা যাচ্ছে? ব্যক্তির মৃত্যুতে কেন গোষ্ঠি উৎসব পালন করতে পারে না, ব্যক্তিটির
জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দটাকে সেলিব্রেট করতে?
টেপ রেকর্ডারটা খট করে বন্ধ করল তরুণী সাংবাদিক।
তারপর প্রমিতার চোখে চোখ রেখে সটান প্রশ্ন করল,
- ‘উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত’, আপনার লেখা বই। সেখানে
আপনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর প্রলোভন অস্বীকার করা বেঁচে থাকার মতই কঠিন’। বেশ, আজ মেনে
নিলাম, নাহয়। কিন্তু আপনি নিজেই বা ক্রমাগত এই প্রলোভন অস্বীকার করে চলেছেন কেন, তবে?
কী দায়বদ্ধতা রয়ে গেল, এই নির্জীব, নিরর্থক জীবনের প্রতি? নাকী… বেঁচে থাকতে লোভ হয়,
তবুও? সরি, এ প্রশ্নটা অন দ্য রেকর্ড করা সম্ভব নয়। উত্তরটাও অফ দ্য রেকর্ডই থাকবে।
ব্যক্তিগত কৌতুহল, বলতে পারেন। উত্তর দিতে না চাইলে, দেবেন না।
একগাল হাসলেন প্রমিতা চন্দ্র।
-
- কেন দেব না? এটাই তো মজা… সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো লোকে
অফ দ্য রেকর্ডই করে, আর উত্তরও থেকে যায় আড়ালেই…। আসলে, মৃত্যুর সঙ্গে একধরণের খেলা
চলে আমার। আমি খেলতে ভালোবাসি। লোভ তো রয়েইছে, তবে অ্যাড্রেন্যালিনের… জীবনের নয়।
- - কী খেলেন? মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলেন না, আশা করি?
- - নাহ, রাশিয়ান র্যুলে। আমার প্রিয় খেলা।
শেষ পর্যন্ত, প্রমিতার এই ইন্টারভিউয়ের আনকাট ভার্সানটাই ছাপায় সেই তরুণী
সাংবাদিক। ‘অফ দ্য রেকর্ড’ অংশটুকুও সে ছাপায় অবিকল। এডিটর নিজেও লোভ সামলাতে পারেন
না… যদিও… আত্মহত্যায় প্ররোচনার কেস হতে পারে কাগজটির ওপর, এমন একটা আশংকা ছিলই। যদিও,
শেষ পর্যন্ত, কেউই তেমন কোনও কেস করে না… পুলিশও নয়। প্রমিতা চন্দ্রকে অপছন্দ করে না
এমন মানুষ বিরল থেকে বিরলতর হয়ে উঠছিল।
১০।
আজ প্রমিতার জন্মদিন। প্রতি বছরের মত এ বছরও তিনি তাঁর প্রিয় খেলাটা খেলবেন,
আজ। আজ থেকে তিন বছর আগে, একজন সাংবাদিকের করা প্রশ্নের একটা মনগড়া উত্তর দিয়েছিলেন
তিনি। তাঁর নিজের উত্তরটাই শেষে ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছিল তাঁকে। আজ পর্যন্ত কখনও তো তিনি
মিথ্যে বলেননি, আশ্রয় নেননি চাতুরির? তবে কি নিজের কাছেই হেরে যাচ্ছেন, তিনি? তাঁর
প্রিয় খেলা রাশিয়ান র্যুলে, এ কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু তিনি এ খেলা মৃত্যুর সঙ্গে খেলেন,
এ তো সত্যিও নয়! তবে কি তাঁর নিজের বলা সমস্ত কথাই মিথ্যে প্রমাণ করবেন, তিনি নিজেই?
তবে কি… সত্যিকে মেনে নেওয়ার সাহস এমনকী তাঁর নিজেরও রইল না!? তবে কি নিজের ক্ষুদ্রতার
উপলব্ধিকে অতিক্রম করে গেল একটা ঠুনকো আবেগ… তাঁর ইগো?
সে বছরই তাঁর নিজের জন্মদিনের দিন তিনি প্রথম উত্তর খোঁজেন এই যাবতীয় প্রশ্নের।
প্রথমবার, তাঁর হাত কেঁপেছিল… দ্বিতীয়বারও। তিনি ভীষণ অবাক হয়েছিলেন। নাহ… জীবনকে যতটা
নির্জীব মনে হয়, হয়ত ততটাও নয়…! এখনও তাঁকে বিস্মিত করার মত অভিজ্ঞতা বাকি আছে, তাহলে!?
তবে না, তৃতীয়বার আর কাঁপেনি তাঁর হাত। নির্দ্বিধায় ট্রিগার টানতে পেরে এতটাই খুশি
হয়েছিলেন, যে ভুলেই গিয়েছিলেন, বুলেটটা তৃতীয় স্লটেও নেই। তাঁর কি ভয় করছে? বেশ কিছুক্ষণ
ভাবলেন, চতুর্থবার ট্রিগার টানার আগে। নাহ… অনেক খুঁজেও তেমন কিছু আবিস্কার করতে পারলেন
না নিজের মধ্যে। অথচ, কী অপার বিস্ময়ের কথা… যে চতুর্থ কেন, পঞ্চমবারেও একটা ব্যর্থ
‘খটাস’ শব্দ ছাড়া আর কিছুই পেলেন না প্রমিতা! অতি কাঙ্খিত সেই অভিজ্ঞতা… সেই মূহুর্ত…
পেলেন না! খেলাটা একাই খেলতে হচ্ছে বলে একটা নতুন নিয়ম বানিয়েছিলেন তিনি। একটা গুলি,
জোরে ঘুরিয়ে দেওয়া হুইলটা… আর পাঁচবার টানা হবে ট্রিগার। গুলি একমাত্র ষষ্ঠ স্লটে থাকলেই
তিনি মরবেন না। বাকি যে কোনও স্লটে থাকলেই, মৃত্যু অনিবার্য। রিভলবারটা কপালের ঠিক
কোথায় ঠেকালে এক চান্সে খুলি ফুটো হবে, প্রমিতা জানেন। অথচ, কী আশ্চর্য… গুলিটা ছিল
সেই ষষ্ঠ স্লটেই!
আরও এক বছরের অপেক্ষা… বেশ। কিন্তু তারপর থেকে মৃত্যুই যেন তাঁর সঙ্গে এক
অলৌকিক খেলা খেলছে। প্রথম বছর গুলিটা ঠিক ষষ্ঠ স্লটেই ল্যান্ড করায় তিনি একইসঙ্গে হতাশ
এবং বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরপর তিন বছর, সেই একই ঘটনা! যেন একটা টাইম ওয়ার্পে আটকে
যায় প্রতি বছর এই রাতটা! এ কি আদৌ সম্ভব! যেন প্রমিতার মৃত্যুর পরোয়ানা কোনও অতিমানবীয়
আঙুল লিখে ফেলে রেখেছে ডাকবাক্সে… যতক্ষণ না তা এসে পৌছচ্ছে তাঁর কাছে, মৃত্যু তাঁর
কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবেই! সে ধরা দেবে না কিছুতেই!
স্বাভাবিকভাবেই, প্রতি বছর আজকের দিনে প্রমিতা এক অদ্ভূত উত্তেজনা বোধ করেন।
আজ যেমন, সকালে উঠে তাঁর মনে হল… আরও একবার ভালো করে খুঁটিয়ে দেখা উচিৎ তাঁর নিজের
জীবনটাকে, নিজের অনুভূতিগুলোকে… বিশ্লেষণে কোথাও ফাঁক থেকে গেল না তো? তিনি চিরকাল
বিশ্বাস করেছেন, মানুষের এই ক্লান্তিকর বেঁচে থাকার একটাই উদ্দেশ্য, প্রত্যেক মানুষকে
একটা কাজ দিয়ে পাঠানো হয়েছে এই ধরাধামে। তিনি নিজের কাজটা করতে পেরেছেন তো ঠিকঠাক?
সকাল থেকে, তাই, নিজেকেই নিজে রিভিউ করে চলেছেন প্রমিতা।
রাত ঘনিয়ে এলো, ঘন হল উত্তেজনাও। ঠিক রাত বারোটা। তার আগে নয়। সাড়ে দশটা
নাগাদ প্রমিতা ঠিক করলেন, উত্তেজনা কমাতে এক কাপ চা খাবেন, হার্বাল টি। একগাদা চায়ের
কৌটো তিনি পেয়েছেন উপহারে, বিভিন্ন ভক্ত পাঠিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে। কোথাও একটা লেখা হয়েছিল,
তাঁর প্রিয় পাণীয় চা। ওর মধ্যেই একখানা কৌটো আনমনে তুলে নিলেন প্রমিতা। কেটলিতে জল
বসিয়ে মনে মনে হাসলেন তিনি, আয়রনির চোটে। তাঁরও ‘ভক্ত’ রয়েছে পৃথিবীতে! ভাবা যায়! মানুষ
যে সত্যিই কী ফ্যাসিনেটিং…
চায়ের কাপ হাতে বহুতলের খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন প্রমিতা। ধীরে ধীরে
শেষ করলেন চা। চারিদিকে কী অদ্ভূত নিস্তবদ্ধতা… লকডাউনের প্রভাব। নয়ত এই এলাকায় রাত
সাড়ে দশটায় এমন নিস্তব্ধতা অকল্পনীয়। নৈঃশব্দ বড় প্রিয় তাঁর। মানুষ চুপ করে থাকতে শিখল
না। শিখলে জানত, নৈঃশব্দের ভেতরে রয়েছে এক অদ্ভূত সুর… মন দিয়ে শুনলে শোনা যায় কিছু
অলীক শব্দ… বাক্য… গল্প।
চা’টা শেষ করে কাপটা খুব আনমনেই হাত থেকে ফেলে দিলেন প্রমিতা। চারতলা থেকে
জমিতে আছড়ে পড়ে চুরমার হল সেটা। এই অটুট নৈঃশব্দের কারণেই চারতলার বারান্দা থেকেও শোনা গেল,
শব্দটা। নৈঃশব্দকে মূহুর্তে চুরমার করল কাপটা, যেমন কাপটাকে করল মাধ্যাকর্ষণ। মুচকি
হাসলেন প্রমিতা। কী সহজ… ভেঙে ফেলা। আর তক্ষুনি হঠাৎ বমি পেল তাঁর।
গত এক ঘন্টায় প্রায় তিনবার বাথরুম যেতে হয়েছে। গা গুলোচ্ছে, পেট গুড়গুড়
করছে, বমি পাচ্ছে। বুকটা ধড়ফড় করছে কেমন যেন… জিভ কেমন অসাড় লাগছে। গলা শুকিয়ে আসছে
বারবার… জিভ বারবার জড়িয়ে যাচ্ছে, ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা...। এ কী অদ্ভূত কান্ড! গত পাঁচ বছরে একবারও এমনকী জ্বরটুকুও
হয়নি তাঁর কখনও… আর আজই এমন করছে শরীরটা! আজ যে…
নাহ, খেলা তাই বলে থেমে যাবে না। খেলা চলবে নিজের নিয়মেই। ড্রয়িং রুমে তাঁর
ইজিচেয়ারে বসে আছেন প্রমিতা। বারোটা বাজতে আর ঠিক দশ মিনিট বাকি। গুলিটা রিভলবারে পুরে
চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন তিনি। সব রেডি। যদিও, এখন আর তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছেন না। মাথা
ঘুরছে প্রচন্ড, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার। প্রমিতা ক্রমাগত অবাক হচ্ছেন…
ক্রমাগত। এ বেশ নতুন অভিজ্ঞতা। বুকের ভেতরটা কেউ খামচাচ্ছে যেন… বারোটা বাজতে আর ঠিক
দু’মিনিট…
বারোটা বাজল। প্রমিতা রিভলবার-ধরা তাঁর ডান হাতটা তুলতে গিয়ে আবারও ভীষণ
বিস্মিত হলেন। তুলতে পারছেন না তিনি হাতটা। শুধু হাত নয়, পাও নাড়াতে পারছেন না তিনি।
প্যারালিসিস! কীভাবে!? আস্তে আস্তে যেন সারা শরীরটাই অসম্ভব অবশ আর ঠান্ডা হয়ে আসছে…
না, এ হতে পারে না! খেলাটা যে শেষ করতেই হবে! শরীরের সব শক্তি হাতে জড়ো
করে রিভলবারটা তোলার চেষ্টা করলেন প্রমিতা। হাতটা উঠল না, কিন্তু ট্রিগারে চাপ পড়ল।
বুলেটের শব্দ গর্জে উঠল প্রমিতাকে ঘিরে থাকা নৈঃশব্দ দুমড়ে মুচড়ে… তাঁর হাত থেকে পড়ে
গেল রিভলবার।
এ বছর প্রথম স্লটেই ছিল, গুলিটা। প্রমিতার ড্রয়িং রুমের মেঝেতে এখন সেটা
অসহায়ভাবে গেঁথে আছে।
১১।
অমিত, মানে ইন্সপেক্টর চৌধুরী, আবার দু’আঙুলে রগ টিপে বসে আছে। কেসের মোড়
ঘুরে গেছে। টক্সিকোলজি রিপোর্ট মিস চন্দ্রর শরীরে বিষ পেয়েছে। অর্থাৎ সান্যালের সন্দেহই
সঠিক। এবং সেক্ষেত্রে… এটা আর একটা নিরীহ, নির্দোষ সুইসাইড মাত্র থাকছে না। তার মানে…
মার্ডার, মোস্ট ফাউল! অবশ্য, সেটাই বা কীভাবে সম্ভব? দু’মাসের ওপর গৃহবন্দী একজন মহিলা,
কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই। তাকে বিষ কে দেবে, এবং কীভাবে? এমন নয় তো, যে উনি নিজেই
বিষ খেয়েছেন? কিন্তু আত্মহত্যাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে রিভলবার তো ছিলই! আবার বিষ
কেন? সেক্ষেত্রে… এটা কি এক ধরণের প্রিকশান নেওয়া, মৃত্যু সুনিশ্চিত করতে? যদি বিষ
ফেল মারে, তাহলে গুলি। যদি গুলি ফেল মারে, তবে বিষ?
তাও… প্রশ্ন থাকছেই। যে বিষ পাওয়া গেছে সেটা যে সে বিষ নয় যে! এ বিষ উনি
পেলেন কোথায়? কাশ্মীর এবং হিমাচলের দিকেই একমাত্র পাওয়া যায় ভারতে… আর অভিজ্ঞ চোখ ছাড়া
চেনাও মুশকিল…। খুবই রেয়ার বিষ। হেমলক। প্রমিতা চন্দ্র হেমলক পয়জনিং-এ মারা গেছেন।
এখনও আত্মহত্যার সম্ভাবনাটা ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না… কিন্তু কেস যে আরও জটিল
হয়ে গেল! কনফার্ম না করে তো… তার মানে আবার ক্রাইম সিন…! একটাই বাঁচোয়া, উনি একা থাকতেন।
হয়ত কন্টামিনেশন তেমন…
মোবাইলের কর্কশ রিং চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে দিল। উরিব্বাস! কমিশনারের ফোন!
-
- ই-ইয়েস স্যার!?
- - প্রমিতা চন্দ্রর কেসটা আপনার কাছে না? রিপোর্ট কোথায়?
- - স্যার… এইমাত্র টক্সিকোলজিটা পাওয়া গেল… প্রথমে তো স্যার… সুইসাইড
করতে গিয়ে মিসফায়ার আর হার্টফেইল ভেবেছিলাম… কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে… স্যার…
- - কী দেখা যাচ্ছে?
- - হেমলক পয়জনিং, স্যার… খুব প্যাঁচালো ব্যাপার…। তাই রিপোর্টটা
লেখার আগে…
- - টক্সিকোলজির রিপোর্ট আপনি আর তীর্থ সান্যাল ছাড়া কে কে দেখেছে?
- - এখনও কেউ দেখেনি, স্যার।
- - গুড। ওটা ছিঁড়ে ফেলে দিন। সান্যালের সঙ্গে আমি কথা বলে নিয়েছি।
আপনি প্রথমে যা লিখছিলেন রিপোর্টে, ওটাই লিখবেন। সুইসাইড করতে গিয়ে ইনডিসিশন, মিসফায়ার,
এবং তারপর ভয়ে হার্ট ফেইল।
- - কিন্তু স্যার…
- - চৌধুরী, যা বললাম, করুন। এক্সপ্লেইন করার দরকার নেই, তাও খানিক
করেই দিই। এতে লিখতে আপনার সুবিধে হবে। প্রমিতা চন্দ্র এবং তাঁর চিন্তাধারা সমাজের
জন্য ক্ষতিকর। বোঝা যাচ্ছে? তাই ওঁর মারা যাওয়াটাই এনাফ নয়। মরতে ভয় পাওয়া জরুরি। ইনডিসিশন
দরকার, মৃত্যুর মূহুর্তে। গল্পে এগুলো লাগবে। পয়জনিং, তারপর বুলেট, এত কমপ্লিকেট করার
দরকার নেই। গল্পটা সহজ থাকুক। মৃত্যু নিয়ে বিরাট বাতেলা দেওয়া বিদ্রোহী লেখিকা সুইসাইড
করতে গিয়ে, ভয় পেয়ে, হার্ট অ্যাটাকে মরলেন। ক্লিয়ার? এটাই মিডিয়াও চাইছে, আমিও চাইছি।
- - আচ্ছা… স্যার… ওকে।
- - বেশ, রাখলাম তাহলে। এর মধ্যে আবার ন্যাশনাল মিডিয়াও নিউজ করে
বসে আছে। সরকারী নির্দেশ, অবিলম্বে শোকসভার আয়োজন করতে হবে। এখন সেসবের ঝক্কি পোয়াতে
হবে আমাকেই…!
১২।
চয়ন তার বোনের মৃতদেহটা দেখতে পায়নি। ফোনে খবরটা পেয়েছিল... বোন ফলিডল খেয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর
একজন ফুট সোলজার হিসেবে সে তখন কাশ্মীরে পোস্টেড। মৃত্যুকে নাকের ডগায় দেখতে অভ্যস্ত
চয়ন হালদার… কে জানে কিসের শোকে কাঁদছিল সেদিন? বোনের সেই ভিডিওটা দেখেও কাঁদেনি চয়ন,
পা কাটা যাওয়ার খবরে তার চোয়াল শক্ত হয়েছিল। অপেক্ষা করছিল, একটা ছুটির… একটামাত্র
ছুটি পেলেই… সে সব ঠিক করে দেবে।
প্রস্থেটিকের পা লাগিয়ে একজন মেয়ে এভারেস্টে উঠে গেল, আর তার বোন হাঁটতে
পারবে না! দরকার শুধু একটু মনের জোর। চয়ন পারবে, তার বোনের নরম হাতটা ধরে টেনে তুলতে…
সে জানত। আজ সে জানল… সব শেষ। অবশেষে ছুটি পেল সে।
বাড়ি এসে সে দেখল একটা ফাঁকা ঘর, একজন পাথর-হয়ে-যাওয়া বাবা, আর একটা সুইসাইড
নোট, বইয়ের ফাঁকে গোঁজা।
‘দাদাভাই, চললাম রে। এপারটা ভালো না… কিন্তু খাদের শেষে কী আছে, আমরা কি
আর জানি? ওপারটা দেখতে চললাম। মন খারাপ করিস না’।
বারংবার প্রতিটা শব্দ পড়ছিল চয়ন, বারবার মুছে চলেছিল চোখ। যেন সে খুঁজছিল
কোনও এক সংকেত, কোনও কোড ওয়র্ড। হঠাৎ কোন খেয়ালে সে ওই বইটাও হাতে তুলে নিল, যার মধ্যে
গোঁজা ছিল নোটটা। মলাটে চোখ আটকে গেল তার, কুঁচকে উঠল ভুরু। ‘মৃত্যু এবং এক বালিকা’।
দ্রুত পাতা ওল্টাতে শুরু করল সে।
বইটা যখন শেষ হল, তখন সন্ধে নেমে এসেছে। আলো জ্বালাল না চয়ন। বইটা হাতে
নিয়ে বিছানার ওপর বসে রইল, চুপচাপ। কেমন নির্বিকার লাগছে তাকে। চোখের জল গেছে একেবারে
শুকিয়ে। না, তার মনে কোনও তত্বের উদয় হল না, কোনও প্রশ্নের উদয় হল না। কিছুক্ষণ পর
সে শান্তভাবে একটা নম্বরে ফোন করল তার মোবাইল থেকে।
-
উও যো জেহরিলে পাত্তো কে বারে মেঁ কঁহা থা তুনে… ওয়াহা উগতা
হ্যয় না… ভেজ সকতা হ্যয়?
মাস দুয়েক পর, পাতাগুলো পেয়ে আগে সেগুলোকে একটু শুকিয়ে নিয়েছিল সে… হেমলক
গাছের পাতা। তারপর দার্জিলিং চায়ের কৌটোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, যাতে একটু কটু-গন্ধওয়ালা
হার্বাল টি মনে হয় শুঁকে। খুব সুন্দর করে প্যাক করেছিল, সঙ্গে লিখেছিল একটা ছোট্ট নোট
–
‘আমার বোন জীবন দিয়ে বিশ্বাস করেছে আপনাকে। তাই, আপনাকে সম্মান জানাতে আপনার
সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাই পাঠালাম আপনাকে। এর স্বাদ নিতে ভুলবেন না, দয়া করে’।
সরকার লকডাউন ঘোষণা করার ঠিক দু’দিন আগে ক্যুরিয়ার সার্ভিস যত্ন সহকারে
পৌছে দিয়েছিল সেই পার্সেল, সঠিক ঠিকানায়।
অধীশা সরকার
অধীশা সরকার
